পৃষ্ঠটান (Surface Tension)

সম্পূর্ণ টিউটোরিয়াল – সংজ্ঞা, পরীক্ষা, সূত্র, একক এবং L-এর মান নির্ণয়

পৃষ্ঠটান কী?
পৃষ্ঠটানের পরীক্ষামূলক প্রমাণ

পরীক্ষা ১: তারের ফ্রেম ও সাবানের পর্দা

প্রথমে একটি আয়তাকার তারের ফ্রেম নাও। এরপর খুবই হালকা একটি চিকন তারকে ফ্রেমের ভেতরে এমনভাবে লাগাও, যাতে সেটি সহজে এদিক-সেদিক সরে যেতে পারে। এবার পুরো ফ্রেমটিকে সাবান-পানিতে ডুবিয়ে আবার তুলে আনো। দেখবে, ফ্রেমের দুই পাশে সাবান-পানির একটি পাতলা পর্দা (Thin Film) তৈরি হয়েছে।

এখন যেকোনো এক পাশের সাবানের পর্দাটিকে আঙুল দিয়ে স্পর্শ করো। স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে সেই পাশের পর্দাটি ফেটে যাবে। তখন লক্ষ্য করবে, মাঝখানের হালকা চিকন তারটি আর আগের অবস্থানে থাকবে না; বরং দ্রুত অপর পাশের দিকে সরে যাবে।

কারণ: যে পাশে এখনও সাবানের পাতলা পর্দা রয়েছে, সেই পর্দাটি তার পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল কমিয়ে আনতে চায়। ফলে পর্দাটি চিকন তারটির ওপর একটি টান বল প্রয়োগ করে এবং তারটি সেদিকে সরে যায়। কিন্তু শুরুতে যখন দুই পাশেই সাবানের পর্দা ছিল, তখন দুই পাশ থেকেই সমান পৃষ্ঠটান বল ক্রিয়া করছিল। তাই লব্ধি বল শূন্য ছিল এবং তারটি স্থির অবস্থায় ছিল। এক পাশের পর্দা ফেটে যাওয়ার পর অন্য পাশের পৃষ্ঠটান বল একাই ক্রিয়া করে, ফলে তারটি সেই দিকে সরে যায়।

মূল সিদ্ধান্ত: এখান থেকে বোঝা যায়, তরলের এমন একটি ধর্ম রয়েছে যার কারণে তরল তার মুক্ত পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফলকে সর্বনিম্ন রাখতে চায়। এই ধর্মই হলো পৃষ্ঠটান
সংজ্ঞা: পৃষ্ঠটান বল ও পৃষ্ঠটান

পৃষ্ঠটান বল (Surface Tension Force): তরলের মুক্ত পৃষ্ঠে একক দৈর্ঘ্যের ওপর ক্রিয়াশীল স্পর্শকীয় বলকে পৃষ্ঠটান বল বলে।

পৃষ্ঠটান (Surface Tension): আর পৃষ্ঠটান হলো, এই একক দৈর্ঘ্যের ওপর ক্রিয়াশীল পৃষ্ঠটান বলের মান।
আরেকটি পরীক্ষার মাধ্যমে পৃষ্ঠটান

একটি আয়তাকার তারের ফ্রেম নিয়ে সেটিকে সাবান-পানিতে ডুবিয়ে তুলে আনলে একটি পাতলা সাবানের পর্দা তৈরি হবে। এবার একটি সুতা প্রথমে সাবান-পানিতে ভিজিয়ে সেই পর্দার ওপর আলতো করে রাখো। (সুতা ভেজানো না থাকলে পর্দা সঙ্গে সঙ্গে ফেটে যাবে, তাই অবশ্যই আগে সুতাটি ভিজিয়ে নিতে হবে।)

এবার সুতার ভেতরের অংশে আলতো করে স্পর্শ করলে ভেতরের সাবানের পর্দাটি ফেটে যাবে। তখন দেখবে, সুতাটি নিজে থেকেই টানটান হয়ে প্রায় বৃত্তাকার আকৃতি ধারণ করেছে।

কারণ: শুরুতে সুতার ভেতরে ও বাইরে—উভয় পাশেই সাবানের পর্দা ছিল। ফলে দুই দিক থেকেই সমান পৃষ্ঠটান বল ক্রিয়া করছিল এবং লব্ধি বল শূন্য হওয়ায় সুতা আগের অবস্থায় ছিল। কিন্তু ভেতরের পর্দাটি ফেটে যাওয়ার পর ভেতরের দিকের পৃষ্ঠটান বল আর থাকে না। তখন কেবল বাইরের পর্দার পৃষ্ঠটান বল ক্রিয়া করে। এই বল সুতাটিকে টেনে এমন একটি আকৃতি দেয়, যাতে বাইরের সাবানের পর্দার ক্ষেত্রফল সর্বনিম্ন হয়। তাই সুতা বৃত্তাকার হয়ে যায়।

পানির ফোঁটা গোলাকার হয় কেন?

পানির ফোঁটা গোলাকার হওয়ার কারণও পৃষ্ঠটান।

একই আয়তন বা একই ভরের তরলকে বিভিন্ন আকৃতিতে রাখা যায়, যেমন—ঘনক, সিলিন্ডার, শঙ্কু বা গোলক। কিন্তু এদের মধ্যে গোলকের পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল সবচেয়ে কম

যেহেতু পৃষ্ঠটানের ধর্ম হলো তরলের মুক্ত পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফলকে সর্বনিম্ন রাখা, তাই পানির ফোঁটা স্বাভাবিকভাবেই গোলাকার আকৃতি ধারণ করে। এ কারণে বৃষ্টির ফোঁটা, শিশিরবিন্দু এবং ছোট ছোট পানির ফোঁটা সাধারণত গোলাকার দেখা যায়।

সারসংক্ষেপ: সুতরাং বলা যায়, পৃষ্ঠটান সবসময় তরলের মুক্ত পৃষ্ঠকে সংকুচিত করে তার ক্ষেত্রফলকে সর্বনিম্ন রাখতে চায়। এই কারণেই পানির ফোঁটা গোলাকার হয় এবং সাবানের পাতলা পর্দা টানটান অবস্থায় থাকে।
পৃষ্ঠটানের পরিমাপ ও সূত্র
পৃষ্ঠটান পরিমাপ

পৃষ্ঠটানকে সাধারণত T দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

সুচ ভাসানোর পরীক্ষা

ধরো, একটি পাত্রে পানি নেওয়া হলো। এবার পানির উপর একটি চিকন ধাতব তার বা একটি সুচ ভাসানো হবে। কিন্তু সরাসরি সুচ পানিতে ফেললে এটি সহজে ভেসে থাকবে না; বরং ডুবে যেতে পারে। তাই প্রথমে একটি টিস্যু পেপারের উপর সুচটি রেখে সেটিকে পানির পৃষ্ঠে আলতো করে রাখা হয়। কিছুক্ষণ পর টিস্যু পেপারটি পানি শোষণ করে ভারী হয়ে নিচে ডুবে যায়, কিন্তু সুচটি পানির পৃষ্ঠে ভাসতে থাকে।

এখন লক্ষ্য করো, সুচটির চারপাশে পানি রয়েছে। অর্থাৎ যে অংশে তরল স্পর্শ করে আছে, সেই অংশে তরলের পৃষ্ঠটান বল কাজ করছে। পানির পৃষ্ঠটান সুচটিকে টেনে ধরে রাখে।

পৃষ্ঠটানের সংজ্ঞা: কোনো তরলের মুক্ত পৃষ্ঠে কল্পিত কোনো রেখার একক দৈর্ঘ্যের উপর লম্বভাবে ক্রিয়াশীল পৃষ্ঠটানজনিত বলকে পৃষ্ঠটান বলে।
সূত্র: T = F / L
পৃষ্ঠটানের একক: নিউটন/মিটার (N/m)
গুরুত্বপূর্ণ: L-এর অর্থ
L হলো কোনো বস্তুর সেই দৈর্ঘ্য, যে দৈর্ঘ্য পর্যন্ত তরল বস্তুকে স্পর্শ করে থাকে।
L ≠ ডুবে থাকা দৈর্ঘ্য
পৃষ্ঠটানের সূত্রে L-এর মান নির্ণয়
বিভিন্ন আকৃতির জন্য L-এর মান

১. পানিতে সরু তার বা সুচ ভাসানো

সুচের দুই পাশে পানির সংস্পর্শ রয়েছে। তাই মোট স্পর্শ করা দৈর্ঘ্য = 2L

অতএব, T = F / 2L

সতর্কতা: নিচের অংশটি দৈর্ঘ্য নয়, এটি ক্ষেত্রফল। পৃষ্ঠটানের ক্ষেত্রে শুধু সেই দৈর্ঘ্য নিতে হবে, যে দৈর্ঘ্য তরলের মুক্ত পৃষ্ঠকে স্পর্শ করে আছে।

২. বৃত্তাকার সরু তার বা রিং

ভিতর ও বাইর—উভয় পাশেই পানির সংস্পর্শ আছে। মোট দৈর্ঘ্য = 4πr

অতএব, T = F / 4πr

৩. বৃত্তাকার চাকতি

শুধু বাইরের অংশ পানির সংস্পর্শে আছে। মোট দৈর্ঘ্য = 2πr

অতএব, T = F / 2πr

৪. ফাঁপা পাতলা সিলিন্ডার

ভিতর ও বাইর—উভয় পাশেই পানির সংস্পর্শ আছে। মোট দৈর্ঘ্য = 4πr

অতএব, T = F / 4πr

৫. নিরেট সিলিন্ডার

শুধু বাইরের অংশ পানির সংস্পর্শে আছে। মোট দৈর্ঘ্য = 2πr

অতএব, T = F / 2πr

৬. ঘনক

ঘনকের দৈর্ঘ্য a ও প্রস্থ b হলে, মোট দৈর্ঘ্য = 2(a+b)

অতএব, T = F / 2(a+b)

ক্রমবস্তুর আকৃতিস্পর্শ করা দৈর্ঘ্য (L)
১.সরু তার / সুচ2L
২.বৃত্তাকার রিং4πr
৩.বৃত্তাকার চাকতি2πr
৪.ফাঁপা সিলিন্ডার4πr
৫.নিরেট সিলিন্ডার2πr
৬.ঘনক2(a+b)
5