পৃষ্ঠশক্তি (Surface Energy)

সম্পূর্ণ টিউটোরিয়াল – পৃষ্ঠশক্তি, পৃষ্ঠটানের সাথে সম্পর্ক, কৈশিকতা, সান্দ্রতা ও প্রান্তবেগ

পৃষ্ঠশক্তি কী?
পৃষ্ঠশক্তির পরীক্ষামূলক প্রমাণ

পৃষ্ঠশক্তিকে E দিয়ে প্রকাশ করা হয়।

সংজ্ঞা (Definition): পৃষ্ঠশক্তি: একক ক্ষেত্রফল বৃদ্ধিতে কৃত কাজ।

এখন বিষয়টি একটু সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করি। ধরো, একটি সাবান বুদবুদ ফোলানো হচ্ছে। এর প্রাথমিক ব্যাসার্ধ r₁

সাবান বুদবুদের পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল কত হবে? সাধারণ গোলকের পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল 4πr²। কিন্তু সাবান বুদবুদ—এর দুটি পৃষ্ঠ আছে: একটি ভেতরের পৃষ্ঠ, আরেকটি বাইরের পৃষ্ঠ। তাই মোট ক্ষেত্রফল হবে 8πr²

পানির ফোঁটার ক্ষেত্রে পৃষ্ঠ থাকে শুধু একটি, কারণ ভেতরে পানি থাকে, কোনো ফাঁপা অংশ থাকে না। কিন্তু বুদবুদের ভেতরে বায়ু থাকে, তাই ভেতরের আর বাইরের—দুটি পৃষ্ঠই হিসাব করতে হয়।

এখন যদি আমি স্ট্র দিয়ে বুদবুদটিতে ফুঁ দিই, তবে এর ব্যাসার্ধ বাড়বে। মনে করি, নতুন ব্যাসার্ধ হলো r₂

তাহলে ক্ষেত্রফল বাড়ল—বাইরের পৃষ্ঠেরও বাড়ল, ভেতরের পৃষ্ঠেরও বাড়ল। নতুন ক্ষেত্রফল হবে 8πr₂²

ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি হয়েছে:

ΔA = A₂ − A₁ = 8πr₂² − 8πr₁²

এই ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি করতে পৃষ্ঠটানের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। কারণ পৃষ্ঠটান সবসময় ক্ষেত্রফল ক্ষুদ্রতম রাখতে চায়। কিন্তু আমি ফুঁ দিয়ে ক্ষেত্রফল বাড়াচ্ছি—তাই পৃষ্ঠটানজনিত বলের বিরুদ্ধে কাজ করছি।

ধরা যাক, ΔA পরিমাণ ক্ষেত্রফল বৃদ্ধিতে W পরিমাণ কাজ করা হলো (এটি বাহ্যিক agent-এর দ্বারা কৃত কাজ)।

এখন একক ক্ষেত্রফল বৃদ্ধিতে কৃত কাজের পরিমাণ:

W / ΔA

এই একক ক্ষেত্রফল বৃদ্ধিতে কৃত কাজকেই পৃষ্ঠশক্তি (Surface Energy) বলে। একে E দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

সূত্র (Formula):
E = W / ΔA
W = E × ΔA
একক (Unit):
J/m²

কারণ কাজের একক জুল, ক্ষেত্রফলের একক বর্গমিটার।

মজার ব্যাপার হলো, কোনো তরলের ক্ষেত্রে পৃষ্ঠটান (Surface Tension) এবং পৃষ্ঠশক্তি (Surface Energy)-এর মান পরিমাণগতভাবে একই। পৃষ্ঠটান একটি ধ্রুবক মান।

পৃষ্ঠশক্তির সঙ্গে পৃষ্ঠটানের সম্পর্ক
পৃষ্ঠশক্তির সঙ্গে পৃষ্ঠটানের সম্পর্ক

একটি নির্দিষ্ট তরলের জন্য পৃষ্ঠটানের একটি নির্দিষ্ট মান থাকে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কোনো নির্দিষ্ট তরলের পৃষ্ঠটান একটি ধ্রুবক রাশি।

পৃষ্ঠটানের সূত্র হলো,

T = F / L

এখানে, T = পৃষ্ঠটান, F = পৃষ্ঠটানজনিত বল এবং L = যে দৈর্ঘ্যের ওপর বলটি ক্রিয়া করে।

সংজ্ঞা (Definition): পৃষ্ঠটান: একক দৈর্ঘ্যে প্রযুক্ত পৃষ্ঠটানজনিত বল।

এখন মনে হতে পারে, L-এর মান পরিবর্তন করলে T-এর মানও পরিবর্তিত হবে। কিন্তু বিষয়টি আসলে তা নয়।

যদি L-এর মান বাড়ানো হয়, তাহলে F-এর মানও একই অনুপাতে বাড়বে। আবার L-এর মান কমানো হলে F-এর মানও একই অনুপাতে কমবে। ফলে F ও L-এর অনুপাত অপরিবর্তিত থাকবে।

যেমন, L-এর মান দ্বিগুণ করলে F-এর মানও দ্বিগুণ হবে। তাই T = F / L এর মান একই থাকবে।

অর্থাৎ, একক দৈর্ঘ্যে প্রযুক্ত পৃষ্ঠটানজনিত বলই পৃষ্ঠটান, এবং একটি নির্দিষ্ট তরলের জন্য এর মান নির্দিষ্ট ও ধ্রুবক।

পানির জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৃষ্ঠটানের একটি নির্দিষ্ট মান রয়েছে। একইভাবে দুধ, তেল, গ্লিসারিন ইত্যাদি প্রতিটি তরলের জন্য পৃষ্ঠটানের নির্দিষ্ট মান রয়েছে।

পৃষ্ঠশক্তি ও পৃষ্ঠটানের সম্পর্ক

পৃষ্ঠশক্তি (E)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী,

E = W / ΔA

অর্থাৎ, একক ক্ষেত্রফল বৃদ্ধিতে কৃত কাজকে পৃষ্ঠশক্তি বলে।

অন্যদিকে, পৃষ্ঠটান হলো একক দৈর্ঘ্যে প্রযুক্ত পৃষ্ঠটানজনিত বল।

এখন আমরা প্রমাণ করব যে, একটি নির্দিষ্ট তরলের ক্ষেত্রে পৃষ্ঠশক্তি ও পৃষ্ঠটানের সংখ্যামান সমান।

গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক (Important Relation):
E = T

পৃষ্ঠশক্তিপৃষ্ঠটান-এর সংখ্যামান সমান।

প্রমাণ

ধরো, একটি তারকে বাঁকিয়ে একটি আয়তাকার ফ্রেম তৈরি করা হলো এবং তার সঙ্গে একটি হাতলযুক্ত চলনশীল তার যুক্ত করা হলো। ফ্রেমটিকে সাবান পানিতে নিমজ্জিত করে তুলে নিলে এর মধ্যে একটি পাতলা সাবানের স্তর বা Thin Film তৈরি হবে।

এখন হাতলটি ধরে চলনশীল তারটিকে সামান্য dx দূরত্ব সরিয়ে নেওয়া হলো। ফলে সাবানের পাতলা স্তরটির ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি পাবে।

সাবানের স্তরটির দুটি পৃষ্ঠ রয়েছে—একটি সামনের পৃষ্ঠ এবং একটি পেছনের পৃষ্ঠ। তাই dx দূরত্ব সরানোর ফলে ক্ষেত্রফলের বৃদ্ধি হবে,

dA = 2L × dx

এখানে L হলো চলনশীল তারটির দৈর্ঘ্য।

পাতলা সাবানের স্তরের কারণে চলনশীল তারটির ওপর পৃষ্ঠটানজনিত বল ক্রিয়া করে। যেহেতু সাবানের স্তরের দুটি পৃষ্ঠ রয়েছে, তাই মোট কার্যকর দৈর্ঘ্য 2L।

পৃষ্ঠটানের সংজ্ঞা অনুযায়ী,

T = F / 2L

অতএব, F = 2TL

এখন dx দূরত্ব সরানোর ফলে কৃত কাজ,

dW = F × dx

এখানে বল ও সরণ একই দিকে, তাই,

dW = F × dx

এখন F = 2TL বসালে,

dW = 2TL × dx

আবার, পৃষ্ঠশক্তির সংজ্ঞা অনুযায়ী,

E = dW / dA

এখন dW = 2TL × dx এবং dA = 2L × dx বসিয়ে পাই,

E = (2TL × dx) / (2L × dx)
E = T

সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, একটি নির্দিষ্ট তরলের ক্ষেত্রে পৃষ্ঠশক্তি ও পৃষ্ঠটানের সংখ্যামান সমান।

তবে পৃষ্ঠশক্তি ও পৃষ্ঠটান একই রাশি নয়।

  • পৃষ্ঠশক্তি হলো একক ক্ষেত্রফল বৃদ্ধিতে কৃত কাজ।
  • পৃষ্ঠটান হলো একক দৈর্ঘ্যে প্রযুক্ত পৃষ্ঠটানজনিত বল।

তাদের সংখ্যামান সমান হলেও তাদের সংজ্ঞা ও একক প্রকাশের দিক থেকে বিষয়টি আলাদা।

একক তুলনা (Unit Comparison):

পৃষ্ঠশক্তির একক: J/m²

পৃষ্ঠটানের একক: N/m

এ দুটি একক সমতুল্য, কারণ 1 J = 1 N·m

1 J/m² = 1 N/m

উদাহরণস্বরূপ, পানির পৃষ্ঠটান নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় প্রায় T = 72×10⁻³ N/m হলে একই অবস্থায় পানির পৃষ্ঠশক্তির মানও হবে E = 72×10⁻³ J/m²

অর্থাৎ, E = T

তাই কোনো সমস্যায় E-এর মান প্রয়োজন হলে T-এর মান দেওয়া থাকলে, একই তরল ও একই অবস্থার জন্য তাদের সমান সংখ্যামান ব্যবহার করা যায়।

কেসগুলো আলোচনা
বুদবুদ ও পানির ফোঁটা
কেস–১: বুদবুদ (বায়ু বুদবুদ বা সাবান বুদবুদ)

একটি বায়ু বুদবুদ বা সাবান বুদবুদকে বড় বুদবুদে পরিণত করা হলো।

বুদবুদের দুটি পৃষ্ঠ রয়েছে—একটি ভেতরের পৃষ্ঠ এবং একটি বাইরের পৃষ্ঠ। তাই মোট ক্ষেত্রফল,

A = 2 × 4πr² = 8πr²

ধরা যাক, প্রাথমিক ব্যাসার্ধ r থেকে বাড়িয়ে নতুন ব্যাসার্ধ R করা হলো।

তাহলে,

A₁ = 8πr²
A₂ = 8πR²

ক্ষেত্রফলের পরিবর্তন,

ΔA = A₂ − A₁ = 8πR² − 8πr² = 8π(R² − r²)

কৃত কাজের সূত্র, W = T × ΔA

মান বসিয়ে,

কেস–১: বুদবদের কৃত কাজের সূত্র
W = 8πT (R² − r²)
কেস–২: পানির ফোঁটা

একটি পানির ফোঁটাকে বড় পানির ফোঁটায় পরিণত করা হলো (আরও পানি যোগ করে)।

পানির ফোঁটার একটি মাত্র পৃষ্ঠ থাকে (শুধু বাইরের পৃষ্ঠ)। তাই ক্ষেত্রফল,

A = 4πr²

প্রাথমিক ব্যাসার্ধ r থেকে বাড়িয়ে নতুন ব্যাসার্ধ R করা হলে,

A₁ = 4πr²
A₂ = 4πR²

ক্ষেত্রফলের পরিবর্তন,

ΔA = A₂ − A₁ = 4πR² − 4πr² = 4π(R² − r²)

কৃত কাজের সূত্র, W = T × ΔA

মান বসিয়ে,

কেস–২: পানির ফোঁটার কৃত কাজের সূত্র
W = 4πT (R² − r²)
মনে রাখুন
  • বুদবুদ (সাবান বুদবুদ / বায়ু বুদবুদ) → W = T (R² − r²)
  • পানির ফোঁটা (কঠিন বা তরলের ফোঁটা) → W = T (R² − r²)

কারণ বুদবুদে দুটি পৃষ্ঠ থাকে, পানির ফোঁটায় একটি পৃষ্ঠ থাকে।

কেস–৩: ছোট ফোঁটাকে একত্রিত করা
ছোট ফোঁটাকে একত্রিত করা

N সংখ্যক ছোট পানির ফোঁটাকে একত্রিত করে একটি বড় পানির ফোঁটায় পরিণত করা হলো।

ছোট ফোঁটার ব্যাসার্ধ r এবং বড় ফোঁটার ব্যাসার্ধ R।

পানির ফোঁটার পৃষ্ঠ থাকে একটি মাত্র। তাই,

প্রাথমিক মোট ক্ষেত্রফল (ছোট ফোঁটাগুলোর):

A₁ = N(4πr²)

শেষ ক্ষেত্রফল (বড় ফোঁটা):

A₂ = 4πR²

ক্ষেত্রফলের পরিবর্তন:

ΔA = A₂ − A₁ = 4πR² − 4πNr² = 4π(R² − Nr²)

কৃত কাজের সূত্র: W = T × ΔA

কেস–৩: ছোট ফোঁটা → বড় ফোঁটা (পানি)
W = 4πT (R² − Nr²)
উল্টো ঘটনা: বড় ফোঁটা → ছোট ফোঁটা

একটি বড় পানির ফোঁটাকে N সংখ্যক ছোট ছোট ফোঁটায় পরিণত করা হলো (যেমন: স্প্রে করা)।

প্রাথমিক ক্ষেত্রফল (বড় ফোঁটা):

A₁ = 4πR²

শেষ ক্ষেত্রফল (ছোট ফোঁটাগুলো):

A₂ = N(4πr²)

ক্ষেত্রফলের পরিবর্তন:

ΔA = A₂ − A₁ = 4πNr² − 4πR² = 4π(Nr² − R²)
উল্টো ঘটনা: বড় ফোঁটা → ছোট ফোঁটা (পানি)
W = 4πT (Nr² − R²)
বুদবুদের ক্ষেত্রে একত্রিত করা ও ভাঙা

বুদবুদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য, শুধু পার্থক্য হলো বুদবুদের দুটি পৃষ্ঠ থাকে, তাই 4π-এর পরিবর্তে 8π হবে।

ছোট বুদবুদ → বড় বুদবুদ
W = 8πT (R² − Nr²)
বড় বুদবুদ → ছোট বুদবুদ
W = 8πT (Nr² − R²)
সব সূত্র একসাথে (সারসংক্ষেপ)
  • পানির ফোঁটা (একটি পৃষ্ঠ):
    • ছোট → বড়: W = 4πT (R² − Nr²)
    • বড় → ছোট: W = 4πT (Nr² − R²)
  • বুদবুদ (দুইটি পৃষ্ঠ):
    • ছোট → বড়: W = 8πT (R² − Nr²)
    • বড় → ছোট: W = 8πT (Nr² − R²)

মনে রাখবেন: N = ফোঁটা/বুদবুদের সংখ্যা, r = ছোটটির ব্যাসার্ধ, R = বড়টির ব্যাসার্ধ।

স্পর্শকোণ (Contact Angle)
স্পর্শকোণের চিত্র
স্পর্শকোণ বলতে কী বোঝায়?

কোনো পাত্রে তরল রাখলে পাত্রের কিনারার কাছে তরলের উপরিতল বক্র হয়। যেমন—কাচের পাত্রে পানি রাখলে কিনারার কাছে পানি উপরে উঠে আসতে চায়, ফলে একটি অবতল তল তৈরি হয়। অন্যদিকে, কাচের পাত্রে পারদ রাখলে কিনারার কাছে পারদ নিচের দিকে বেঁকে যায়, ফলে একটি উত্তল তল তৈরি হয়।

সংজ্ঞা (Definition): স্পর্শকোণ: কঠিন ও তরলের সংস্পর্শতলে তরলের বক্রপৃষ্ঠে অঙ্কিত স্পর্শক কঠিনের সাথে তরলের ভেতর থেকে যে কোণ তৈরি করে, তাকে স্পর্শকোণ বলে।
স্পর্শকোণের সূত্র/সংকেত
স্পর্শকোণ = θ
  • θ < 90° → সূক্ষ্মকোণ (Acute Angle)
  • θ > 90° → স্থূলকোণ (Obtuse Angle)
স্পর্শকোণ কেন হয়?

তরল ও কঠিনের সংস্পর্শে দুই ধরনের বল কাজ করে:

  1. সংশক্তি বল (Cohesive Force): একই পদার্থের অণুগুলোর মধ্যে আকর্ষণ।
  2. আসক্তি বল (Adhesive Force): ভিন্ন পদার্থের অণুগুলোর মধ্যে আকর্ষণ।
পানি ও কাচের ক্ষেত্রে

পানি ও কাচের ক্ষেত্রে,

আসক্তি বল > সংশক্তি বল

অর্থাৎ, পানির সাথে কাচের আকর্ষণ (আসক্তি) পানির সাথে পানির আকর্ষণ (সংশক্তি)-এর চেয়ে বেশি।

এই কারণে পানি কাচের সাথে উঠে আসতে চায় এবং বক্রতল তৈরি করে। ফলে স্পর্শকোণ θ হয় সূক্ষ্মকোণ

পানি ও কাচের ক্ষেত্রে
  • আসক্তি > সংশক্তি
  • স্পর্শকোণ θ = সূক্ষ্মকোণ (< 90°)
  • তরল কঠিনকে ভিজায় (Wetting)
পারদ ও কাচের ক্ষেত্রে

পারদ ও কাচের ক্ষেত্রে,

সংশক্তি বল > আসক্তি বল

অর্থাৎ, পারদের সাথে পারদের আকর্ষণ (সংশক্তি) পারদের সাথে কাচের আকর্ষণ (আসক্তি)-এর চেয়ে বেশি।

এই কারণে পারদ কাচের সাথে উঠে আসতে চায় না, বরং নিজের সাথে থাকতে চায়। ফলে স্পর্শকোণ θ হয় স্থূলকোণ

পারদ ও কাচের ক্ষেত্রে
  • সংশক্তি > আসক্তি
  • স্পর্শকোণ θ = স্থূলকোণ (> 90°)
  • তরল কঠিনকে ভিজায় না (Non-wetting)
স্পর্শকোণের সারসংক্ষেপ
তরল-কঠিনবল তুলনাস্পর্শকোণভেজানো
পানি-কাচআসক্তি > সংশক্তিসূক্ষ্মকোণভিজায়
পারদ-কাচসংশক্তি > আসক্তিস্থূলকোণভিজায় না

উদাহরণ:

  • কচুর পাতায় পানি ভেজে না (সংশক্তি > আসক্তি)
  • আমপাতায় পানি ভেজে (আসক্তি > সংশক্তি)
  • থার্মোমিটার ভাঙলে পারদ কাগজের উপর দিয়ে দৌড়ায় (ভিজায় না)

বিশেষ দ্রষ্টব্য: স্পর্শকোণ ও পৃষ্ঠটানের কারণে, এবং আসক্তি ও সংশক্তির কারণে কৈশিকতা (Capillarity) হয়ে থাকে।

কৈশিকতা (Capillarity)
কৈশিক নলে তরলের ঊর্ধ্ব ও নিম্ন গমন

ধরো, এটা একটা পাত্র। আর এটা আরেকটা পাত্র। দুইটা পাত্র। এই পাত্রে তুমি পানি নিচ্ছো। পানি নিয়ে এর মধ্যে দুইটা কৈশিক নল ডুবিয়েছো। একটা বেশ সরু কৈশিক নল—দুই মুখ খোলা। আরেকটা বেশ মোটা কৈশিক নল, অর্থাৎ যার ব্যাস বেশি।

এবার দেখো কী হয়। এতে আছে পানি। পানি আছে কাচের পাত্রে। আর কৈশিক নল হচ্ছে কাচের নল। দেখো, পানির পৃষ্ঠটা যদি এরকম হয়, কঠিন এবং তরলের সংস্পর্শতলে পানি উঠে আসতে চাচ্ছে। এখানেও তাই, পানি উঠে আসতে চাচ্ছে। এরকম অবস্থা হবে।

এইবার দেখবে, এই কৈশিক নলের মধ্যে পানি ঢুকে গেছে। তুমি দেখবে, যেটা সরু কৈশিক নল, সেখানে পানি উঠে গেছে অনেক বেশি। আর যেটা মোটা কৈশিক নল, সেখানে পানি এতটুকু উঠে থেমে গেছে। অর্থাৎ, কৈশিক নল যত সরু হবে, পানি তত বেশি উঠবে। আর যেটার ব্যাস বেশি, সেটাতে তুলনামূলক কম উঠবে।

কৈশিক নলে পানির এই যে উঠে আসা, এই ঘটনাটাকে বলা হয় কৈশিকতা

আবার, আমি যদি পারদ নিই—Mercury বা পারদ—কাচের পাত্রে, এবং তার মধ্যে কাচের কৈশিক নল ডুবাই, তাহলে পারদের পৃষ্ঠটা কাচের সাথে মিশতে চায় না। এ কারণে উত্তল তল তৈরি করে। পানি হলে কৈশিক নল বেয়ে উপরে উঠবে, আর পারদ কৈশিক নল বেয়ে নিচে নামবে। যেটা সরু নল, তাতে পারদ বেশি নিচে নেমে যায়। আর যেটা অপেক্ষাকৃত মোটা, সেটাতে পারদ সামান্য নিচে নেমে যায়।

তাই,

  • পানির ক্ষেত্রে কৈশিক নলে উপরে উঠে আসে (ঊর্ধ্ব আহরণ)।
  • পারদের ক্ষেত্রে কৈশিক নলে নিচে নেমে যায় (নিম্ন গমন)।
সংজ্ঞা (Definition): কৈশিকতা: কৈশিক নলে পৃষ্ঠটানের কারণে তরলের ঊর্ধ্ব আহরণ বা নিম্ন গমনের ঘটনাকে কৈশিকতা বলে।
পানি ও পারদের তুলনা
বিষয়পানিপারদ
কৈশিক নলে অবস্থানউপরে উঠেনিচে নেমে যায়
স্পর্শকোণসূক্ষ্মকোণস্থূলকোণ
বলের সম্পর্কআসক্তি > সংশক্তিসংশক্তি > আসক্তি
কৈশিক নলে তরলের ঊর্ধ্ব আহরণ
কৈশিক নলে তরলের ঊর্ধ্ব আহরণ

মনে করো, একটি পাত্রে পানি আছে। এতে একটি কৈশিক নল নিমজ্জিত করা হলো। পানি একটি নির্দিষ্ট লেভেলে ছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—পানি কেন এবং কীভাবে কৈশিক নল বেয়ে উপরে উঠবে?

কৈশিক নলের উপর থেকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে একটি অর্ধগোলাকৃতি পৃষ্ঠ সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে পৃষ্ঠটান। যেহেতু এটি কাচের কৈশিক নল, তাই এখানে পানির সাথে কাচের আসক্তি বল সংশক্তি বলের চেয়ে বেশি। এই কারণেই পৃষ্ঠটি স্পর্শকোণ অনুযায়ী বক্র হয়ে থাকে।

এখন বক্রতলটি লক্ষ্য করো। যদি তলটি সম্পূর্ণ সমতল বা বৃত্তাকার হতো, তাহলে ক্ষেত্রফল কম হতো। গাণিতিকভাবে দেখলে,

বৃত্ততলের ক্ষেত্রফল, A = πr²

আর অর্ধগোলকের বক্রপৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল, A = 2πr²

স্পষ্টতই, 2πr² > πr²। অর্থাৎ বক্রতলের ক্ষেত্রফল বেশি। কিন্তু পৃষ্ঠটান সবসময় ক্ষেত্রফল মিনিমাইজ করতে চায়। তাই পৃষ্ঠটানজনিত বল স্পর্শক বরাবর ক্রিয়া করে তলটিকে সমতল করার চেষ্টা করে। এই প্রচেষ্টাতেই তলটি উপরের দিকে উঠে আসে এবং সাথে সাথে কিছু পানি উপরে টেনে আনে।

পানি উপরে উঠার পর আবার আসক্তি বলের কারণে তলটি পুনরায় বক্র হয়ে যায়। তখন আবার পৃষ্ঠটান কাজ করে, আবার তলকে সমতল করে, আরও কিছু পানি উপরে উঠিয়ে আনে। এইভাবে ক্রমাগত পানি উপরে উঠতে থাকে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি অনবরত চলতে থাকবে? উত্তর হচ্ছে—না। একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় গিয়ে পানি উঠা থেমে যায়। কেন?

যখন পানি একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠে, তখন পৃষ্ঠটানজনিত বলের মান ওই উচ্চতা পর্যন্ত উঠা পানির ওজনের সমান হয়ে যায়। অর্থাৎ, F = mg হলে সাম্যাবস্থা সৃষ্টি হয় এবং পানি আর উপরে উঠে না।

কৈশিক নলে পানির উচ্চতা নির্ণয়

এখন আমরা গাণিতিকভাবে নির্ণয় করব কৈশিক নলে পানি কত উচ্চতা পর্যন্ত উঠবে।

ধরা যাক, কৈশিক নলের ব্যাসার্ধ r, পৃষ্ঠটান T এবং স্পর্শকোণ θ।

পৃষ্ঠটান স্পর্শক বরাবর ক্রিয়া করে। এই বলের উলম্ব উপাংশ,

T × cos θ

যেহেতু কৈশিক নলটি বৃত্তাকার, তাই তার পরিধি,

2πr

সুতরাং মোট পৃষ্ঠটানজনিত বল যা পানি উপরে টানে,

F = 2πr × T × cos θ

অপরদিকে, h উচ্চতা পর্যন্ত উঠা পানির ভর,

m = ρ × আয়তন = ρ × (πr² × h)

এবং তার ওজন,

mg = ρ × πr² × h × g

সাম্যাবস্থায়,

2πr × T × cos θ = ρ × πr² × h × g

এখন h-এর জন্য সমাধান করলে পাই,

কৈশিক নলে তরলের ঊর্ধ্ব আহরণের উচ্চতার সূত্র
h = (2T cos θ) / (ρ g r)

এছাড়া প্রয়োজনে পানির ভর বের করার সূত্র,

m = (2πr × T × cos θ) / g

উল্লেখ্য,

  • যদি θ < 90° (সূক্ষ্মকোণ) হয়, তাহলে h ধনাত্মক হয়—তরল উপরে উঠে (পানির মতো)।
  • যদি θ > 90° (স্থূলকোণ) হয়, তাহলে h ঋণাত্মক হয়—তরল নিচে নেমে যায় (পারদের মতো)।
কৈশিক নলে তরলের উত্থান ও অবনমন
কৈশিক নলে তরলের উত্থান ও অবনমন

ধরো, একটি পাত্রে পানি আছে। এই পানির মধ্যে একটি কৈশিক নল নিমজ্জিত করা হলো। পানির পৃষ্ঠ থেকে কৈশিক নলের মধ্যে কিছুটা পানি উপরে উঠে গেল। এখন প্রশ্ন হলো—পানি কেন উপরের দিকে উঠবে?

কাচের কৈশিক নল এবং পানির ক্ষেত্রে পানির সঙ্গে কাচের আসক্তি বল পানির অণুগুলোর নিজেদের মধ্যে সংশক্তি বলের তুলনায় বেশি। এই কারণে পানি কাচের সঙ্গে লেগে থাকতে এবং কাচের দেয়াল বরাবর উপরের দিকে উঠতে চায়।

কৈশিক নলের ভেতরে পানির পৃষ্ঠ একটি অবতল বক্রপৃষ্ঠ তৈরি করে। পৃষ্ঠটানের কারণে এই বক্রপৃষ্ঠের উপর স্পর্শক বরাবর পৃষ্ঠটান বল কাজ করে।

পৃষ্ঠটান সবসময় তরলের পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফলকে কমিয়ে আনতে চায়। তাই কৈশিক নলের পানির বক্রপৃষ্ঠকে সমতল করার জন্য পৃষ্ঠটানজনিত বল পানিকে উপরের দিকে টেনে তোলে।

এভাবে একটু একটু করে পানি উপরে উঠতে থাকে। কিন্তু পানি চিরকাল উপরে উঠতে থাকে না। একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় গিয়ে পানি স্থির হয়ে যায়। কারণ তখন পানির উপরিভাগে পৃষ্ঠটানজনিত ঊর্ধ্বমুখী বল এবং উপরে উঠে যাওয়া পানির ওজনের মধ্যে সাম্যাবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

সংজ্ঞা (Definition): কৈশিকতা: কৈশিক নলে পৃষ্ঠটানের কারণে তরলের ঊর্ধ্ব আহরণ বা নিম্ন আহরণের ঘটনাকে কৈশিকতা বলে।
কৈশিক নলে তরলের উত্থানের উচ্চতা নির্ণয়

ধরো, একটি কৈশিক নলের ব্যাসার্ধ r। পানির পৃষ্ঠ থেকে কৈশিক নলে পানি h উচ্চতায় উঠে গেছে।

কৈশিক নলের পানির বক্রপৃষ্ঠে পৃষ্ঠটান T স্পর্শক বরাবর কাজ করে।

স্পর্শকোণকে θ ধরা হলো।

পৃষ্ঠটানজনিত বলের উল্লম্ব উপাংশ হবে,

T × cos θ

একক দৈর্ঘ্যে এই বল কাজ করে। কৈশিক নলের মোট পরিধি,

2πr

সুতরাং পুরো পরিধি বরাবর পৃষ্ঠটানজনিত ঊর্ধ্বমুখী বল,

F = 2πr × T × cos θ

এখন, কৈশিক নলে যতটুকু পানি উঠে গেছে, সেই পানির ওজন নিচের দিকে কাজ করবে।

সাম্যাবস্থায়,

2πr × T × cos θ = mg
কৈশিক নলে উঠে যাওয়া তরলের ভর নির্ণয়
m = (2πr × T × cos θ) / g

এখন আমাদের m-এর আরেকটি রূপ বের করতে হবে।

আমরা জানি, m = ρ × V

যেখানে, ρ = তরলের ঘনত্ব, V = উঠে যাওয়া তরলের আয়তন

কৈশিক নলের ব্যাসার্ধ r এবং পানির উত্থানের উচ্চতা h হলে, প্রথমে একটি সিলিন্ডারের আয়তন ধরা যায়,

V₁ = πr² × h

কিন্তু কৈশিক নলের পানির উপরের অংশটি সম্পূর্ণ সিলিন্ডার নয়। এর মধ্যে প্রায় একটি অর্ধগোলকের অংশ বাদ দিতে হবে।

অর্ধগোলকের আয়তন,

V₂ = (2/3)πr³

তাই মোট পানির আয়তন,

V = πr² × h − (2/3)πr³

অতএব পানির ভর,

m = ρ × (πr² × h − (2/3)πr³)
m = ρ × πr² × (h − 2r/3)
ভর নির্ণয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
m = ρπr² (h − 2r/3)
কৈশিক উত্থানের মূল সূত্র

আমরা পেয়েছি,

2πr × T × cos θ = mg

এবং,

m = ρπr² (h − 2r/3)

তাই,

2πr × T × cos θ = ρπr² (h − 2r/3) × g

উভয় পাশে πr কেটে দিলে,

2T cos θ = ρrg (h − 2r/3)
পৃষ্ঠটান নির্ণয়ের সূত্র
T = (ρrg / 2cos θ) (h − 2r/3)

তবে সাধারণত কৈশিক নল খুব সরু হওয়ায় r অত্যন্ত ছোট হয়। তাই 2r/3 অংশটি h-এর তুলনায় নগণ্য ধরা যায়।

তখন,

T = (ρrgh) / (2cos θ)

অথবা,

কৈশিক উত্থানের মূল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
h = (2T cos θ) / (ρrg)
সরু কৈশিক নলের ক্ষেত্রে সূত্র

যদি কৈশিক নলের ব্যাসার্ধ খুব ছোট হয় এবং 2r/3 উপেক্ষা করা হয়, তাহলে,

T = (ρrgh) / (2cos θ)

এবং,

h = (2T cos θ) / (ρrg)

এই সূত্রটি বিভিন্ন ধরনের অঙ্কে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

স্পর্শকোণের প্রভাব

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,

cos θ

এর মান ধনাত্মক বা ঋণাত্মক হতে পারে।

১. θ সূক্ষ্মকোণ হলে

যদি θ < 90° হয়, তাহলে cos θ > 0

সুতরাং h > 0

অর্থাৎ তরল কৈশিক নলে উপরে উঠবে

যেমন—পানি ও কাচের ক্ষেত্রে স্পর্শকোণ সূক্ষ্মকোণ। তাই কাচের কৈশিক নলে পানি উপরে উঠে যায়।

২. θ স্থূলকোণ হলে

যদি θ > 90° হয়, তাহলে cos θ < 0

সুতরাং h < 0

অর্থাৎ তরল কৈশিক নলে নিচে নেমে যাবে

যেমন—পারদ ও কাচের ক্ষেত্রে স্পর্শকোণ স্থূলকোণ। তাই কাচের কৈশিক নলে পারদ নিচে নেমে যায়।

বিশেষ ক্ষেত্রে: পানি ও কাচ

বিশুদ্ধ পানি ও পরিষ্কার কাচের ক্ষেত্রে স্পর্শকোণ প্রায় θ ≈ 0°

তাই cos 0° = 1

এক্ষেত্রে,

h = (2T) / (ρrg)

এটি পানি-কাচের কৈশিক উত্থানের জন্য বহুল ব্যবহৃত সূত্র।

মনে রাখার বিষয়

কৈশিকতার ক্ষেত্রে মূল বিষয়গুলো হলো—

  1. আসক্তি বল বেশি হলে → স্পর্শকোণ সূক্ষ্মকোণ → তরল কঠিনকে ভেজায় → তরল কৈশিক নলে উপরে ওঠে
  2. সংশক্তি বল বেশি হলে → স্পর্শকোণ স্থূলকোণ → তরল কঠিনকে ভেজায় না → তরল কৈশিক নলে নিচে নামে
  3. পৃষ্ঠটানজনিত বল সবসময় পৃষ্ঠের স্পর্শক বরাবর কাজ করে।
  4. কৈশিক নল যত সরু, অর্থাৎ r যত কম, কৈশিক উত্থান বা অবনমন তত বেশি।
  5. মূল সূত্র:
    h = (2T cos θ) / (ρrg)
    এই সূত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং কৈশিকতার অঙ্কে বারবার প্রয়োজন হবে।
সান্দ্র বল ও সান্দ্রতা (Viscous Force & Viscosity)
সান্দ্র বলের চিত্র
সান্দ্র বল কী?

সান্দ্র বল (Viscous Force) হচ্ছে তরলের ঘর্ষণ বল।

কঠিন পদার্থের ক্ষেত্রে যেমন ঘর্ষণ বল থাকে, তেমনি তরলের ক্ষেত্রেও ঘর্ষণের মতো একটি বল কাজ করে। তরলের মধ্যে কোনো বস্তু গতিশীল হলে তার গতির বিপরীত দিকে যে বাধাদানকারী বল অনুভূত হয়, তাকে সান্দ্র বল বলে।

সান্দ্র বলের সংজ্ঞা

তরলের মধ্যে কোনো বস্তু গতিশীল হলে তার গতির বিপরীত দিকে যে ঘর্ষণজাতীয় বাধাদানকারী বল কাজ করে, তাকে সান্দ্র বল বলে।

সান্দ্র বলের ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র আছে—

  1. নিউটনের সান্দ্রতার সূত্র
  2. স্টোকসের সূত্র
নিউটনের সান্দ্রতার সূত্র

ধরো, এটি একটি কঠিন তল। এই কঠিন তলের উপর একটি তরলের স্তর আছে। তরলটি পানি, তেল, মধু বা অন্য কোনো তরল হতে পারে।

এবার তরলের উপরে আরেকটি কঠিন তল রাখা হলো। অর্থাৎ, দুটি কঠিন তলের মাঝখানে একটি তরলের স্তর রয়েছে।

এখন উপরের কঠিন তলটিকে নিচের তলের সাপেক্ষে একটি নির্দিষ্ট বেগে গতিশীল করার চেষ্টা করা হলো।

ধরো, উপরের তলটি v বেগে ডানদিকে গতিশীল হচ্ছে।

তখন তরলের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে আপেক্ষিক গতির কারণে একটি বাধাদানকারী বল তৈরি হবে। এই বাধাদানকারী বলই হলো সান্দ্র বল

তরলের বিভিন্ন স্তরের বেগ

নিচের তলটিকে স্থির বা fixed surface ধরা হলো।

অর্থাৎ, নিচের তলের বেগ, v = 0

এটিকে আমরা reference হিসেবে ধরছি।

উপরের তলের বেগ যদি v হয়, তাহলে নিচের তলের সাপেক্ষে উপরের তলের আপেক্ষিক বেগও v।

এখন দুটি তরল স্তরের মধ্যবর্তী লম্ব দূরত্বকে dy এবং সেই দুই স্তরের আপেক্ষিক বেগের পার্থক্যকে dv ধরা হলো।

তাহলে,

dv / dy

কে বলা হয় বেগের নতি বা বেগ অবক্রম (Velocity Gradient)

বেগের নতি = dv / dy

এটি হলো একক লম্ব দূরত্বে আপেক্ষিক বেগের পরিবর্তন

সান্দ্রতা গুণাঙ্ক (Coefficient of Viscosity)

এখন প্রশ্ন হলো, সান্দ্র বল কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে?

সান্দ্র বল তরলের সান্দ্রতার উপর নির্ভর করে।

সান্দ্রতা বলতে তরলের আঠালো বা প্রবাহের বাধাদানকারী ধর্ম বোঝায়।

যে তরলের সান্দ্রতা বেশি, সেটি তুলনামূলক বেশি আঠালো এবং তার সান্দ্র বলও বেশি।

তরলের এই সান্দ্রতার পরিমাণ প্রকাশ করার জন্য একটি রাশি ব্যবহার করা হয়, যাকে বলে সান্দ্রতা গুণাঙ্ক বা Coefficient of Viscosity

সান্দ্রতা গুণাঙ্ককে সাধারণত η দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

সান্দ্রতা ও ঘনত্ব এক নয়

সান্দ্রতা এবং ঘনত্ব এক জিনিস নয়।

সান্দ্রতা বলতে তরলের আঠালো বা প্রবাহে বাধাদানকারী ধর্ম বোঝায়।

যেমন, তুলনামূলকভাবে—

আলকাতরা > মধু > তেল > দুধ > পানি

সান্দ্রতার দিক থেকে।

অর্থাৎ যার সান্দ্রতা বেশি, তার সান্দ্রতা গুণাঙ্ক η-এর মানও বেশি।

সান্দ্র বল কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে?

ধরো, তরলের দুটি স্তরের সংস্পর্শের ক্ষেত্রফল A।

ক্ষেত্রফল যত বেশি হবে, তরলের সঙ্গে কঠিন তলের সংস্পর্শ তত বেশি হবে। ফলে সান্দ্র বলও বেশি হবে।

অতএব, F ∝ A

অর্থাৎ, সান্দ্র বল ক্ষেত্রফলের সমানুপাতিক

বেগের নতির উপর নির্ভরশীলতা

আবার, দুটি তরল স্তরের আপেক্ষিক বেগ যত বেশি হবে, তাদের মধ্যে সান্দ্র বলও তত বেশি হবে।

অর্থাৎ, F ∝ (dv / dy)

এখানে, dv / dy হলো বেগের নতি।

তাই সান্দ্র বল বেগের নতির সমানুপাতিক

সান্দ্রতা গুণাঙ্কের উপর নির্ভরশীলতা

তরলের সান্দ্রতা যত বেশি হবে, সান্দ্র বলও তত বেশি হবে।

অতএব, F ∝ η

নিউটনের সান্দ্রতার সূত্র

উপরের তিনটি সম্পর্ক একত্র করলে,

F ∝ η × A × (dv / dy)

সমানুপাতিক চিহ্ন তুলে একটি ধ্রুবক বসালে,

F = k × η × A × (dv / dy)

SI পদ্ধতিতে ধ্রুবক k = 1 ধরা হয়।

নিউটনের সান্দ্রতার সূত্র
F = η × A × (dv / dy)
সূত্রটির প্রতিটি রাশির অর্থ
  • F = সান্দ্র বল
  • η = সান্দ্রতা গুণাঙ্ক
  • A = সংস্পর্শের ক্ষেত্রফল
  • dv = আপেক্ষিক বেগের পরিবর্তন
  • dy = দুই স্তরের মধ্যবর্তী লম্ব দূরত্ব
  • dv/dy = বেগের নতি বা বেগ অবক্রম

তাই অঙ্কে যদি F, η, A, dv, dy-এর প্রয়োজনীয় মান দেওয়া থাকে, তাহলে সরাসরি সূত্র ব্যবহার করে সান্দ্র বল বের করা যায়।

খুব সহজভাবে মনে রাখার পদ্ধতি

নিউটনের সান্দ্রতার সূত্রে সান্দ্র বল তিনটি বিষয়ের সঙ্গে সমানুপাতিক—

F ∝ η × A × (dv / dy)

সান্দ্র বল ∝ সান্দ্রতা গুণাঙ্ক × ক্ষেত্রফল × বেগের নতি

তাই,

F = η × A × (dv / dy)

এই সূত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সূত্র থেকে সরাসরি অনেক গাণিতিক সমস্যা আসে।

স্টোকসের সূত্র (Stokes' Law)
স্টোকসের সূত্রের চিত্র

এটা হচ্ছে সান্দ্রবলের আরেকটা সূত্র। এটা হচ্ছে স্টোকসের সূত্র

স্টোকস সান্দ্রবলটাকে ব্যাখ্যা করছে কোন তরলের মধ্য দিয়ে। ধরো, এক বালতি পানি আছে, তার মধ্যে একটা মার্বেল গতিশীল। তুমি ব্রিজের উপরে উঠে নদীর মাঝখানে একটা মার্বেল ফেলে দিয়েছো। এক ড্রাম আলকাতরা আছে, তার মধ্যে একটা মার্বেল ফেলে দিয়েছো। অর্থাৎ, তরলের মধ্য দিয়ে একটা বস্তু গতিশীল।

ধরো, এটা একটা পাত্র। এই পাত্রে তরল আছে, পানি আছে। এবার এই তরলের মধ্য দিয়ে একটা কঠিন বস্তু নিচের দিকে গতিশীল হবে। তাহলে এই হচ্ছে ধরো একটা মার্বেল।

এই মার্বেলটা এই তরলের, এই লিকুইডের মধ্য দিয়ে আস্তে আস্তে, আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামবে। তাহলে এর উপর সান্দ্রবলটা আমরা হিসাব করতে চাই।

তো দেখো, একটা জিনিস খেয়াল করো। এখানে তরলটা নামতেছে কোন দিকে? নিচের দিকে। তো এর আশেপাশে যে তরল আছে, চিন্তা করো। চিন্তা করো যে এটা নিচের দিকে নামতেছে। তাহলে এর আশেপাশে যে তরলের লেয়ার আছে, এরকম আমরা যদি কয়েকটা তরলের লেয়ার চিন্তা করি।

তাহলে এই যে মার্বেলটা, এই মার্বেলের সাথে যে তরলের মলিকিউলগুলো আছে, এটা যদি নিচের দিকে গতিশীল হয়, তাহলে এর আশেপাশে যে মলিকিউলগুলো আছে, সেই মলিকিউলগুলোকে ঠেলে নিয়ে নিচের দিকে নামতে চাইবে। কিন্তু এই মলিকিউলগুলোর বাকি যে মলিকিউলগুলোর সাথে একটা আকর্ষণের সংযুক্তি আছে, সংযুক্তি বলে তো। এই কারণে কী হবে? এটা যদি নিচের দিকে যেতে চায়, তাহলে তারা আবার বল দেবে কোন দিকে? উপরের দিকে।

তাহলে তরলের মধ্য দিয়ে বস্তুটা নিচের দিকে v বেগে গতিশীল। তাহলে তরলের সারফেসের জন্য একটা ফ্রিকশন ফোর্স সে পাচ্ছে উপরের দিকে। এই যে তরলের সারফেসটাকে উপরের দিকে ঠেলতেছে।

শূন্য ধরো, একটা বালতি পানি, মানে একটা বালতি আছে। বালতির মধ্যে খালি একটা মার্বেল টুপ করে নিচে পড়ে যাবে। সেখানে বাতাসের ফ্রিকশনটা আছে, কিন্তু কোনো পানির বা তরলের ফ্রিকশন নাই। বাতাসের মধ্যে থাকলেও কিন্তু সান্দ্রবল কাজ করবে।

তো ধরো, এই যে মার্বেলটা, এই মার্বেলটা পানির মধ্যে দিয়ে পড়তেছে। তো পানির মধ্য দিয়ে পড়লে আশেপাশে পানি আছে। তাহলে পানির লেয়ার ভেদ করে নিচে যাচ্ছে। তাহলে পানি কী করবে? ফ্রিকশন দিবে কোন দিকে? উপরের দিকে।

এই যে পানির যে ফ্রিকশন ফোর্সটা বা তরলের যে ফ্রিকশন ফোর্সটা, সেটা হচ্ছে F।

এবার তুমি বলো, কোনো তরলের মধ্য দিয়ে কোনো বস্তু v বেগে গতিশীল হলে—আর ব্যাসার্ধের একটা গোলক। আমরা স্টোকসের সূত্রটা ব্যাখ্যা করব শুধুমাত্র গোলকের জন্য। আমাদের বইয়ে শুধুমাত্র গোলকের ক্ষেত্রে স্টোকসের সূত্রটা আছে।

কোনো প্রবাহীর মধ্য দিয়ে যদি গোলক আকৃতির কোনো বস্তু গতিশীল হয়, তাহলে স্টোকসের সূত্র সেটা ব্যাখ্যা করছে।

তাহলে কোনো প্রবাহীর মধ্য দিয়ে এবং প্রবাহীটা হচ্ছে শান্ত প্রবাহী। এইখানে যে প্রবাহীটা আছে, সেই প্রবাহীটা বিক্ষিপ্ত না। এখানে মানে স্রোত নেই। শান্ত প্রবাহ, ধারারেখ প্রবাহ।

যেমন কোনো একটা তরলের প্রবাহ যদি এরকম হয়, তাহলে সেটাকে বলা হয় শান্ত প্রবাহ। আর যদি প্রবাহটা এরকম টার্বুলেন্ট প্রবাহ, বিক্ষিপ্ত প্রবাহ হয়, তাহলে সেটা হচ্ছে অশান্ত প্রবাহ।

অশান্ত প্রবাহের জন্য না, শান্ত প্রবাহ। কোনো প্রবাহী সেটা শান্ত প্রবাহী।

শান্ত প্রবাহ বা ধারারেখ প্রবাহ। ধারারেখ প্রবাহের সংজ্ঞাগুলো বই থেকে একটু পড়বা। শান্ত প্রবাহ কাকে বলে, ধারারেখ প্রবাহ কাকে বলে—দেখবা, আছে বইয়ে। সংজ্ঞাগুলো একটু পড়বা।

শান্ত প্রবাহ বা ধারারেখ প্রবাহ যদি হয় এবং সেই প্রবাহীর মধ্য দিয়ে, সেই প্রবাহীর মধ্য দিয়ে কোনো গোলক বস্তু গতিশীল হলে—

গোলক বস্তু গতিশীল হলে তরলের সান্দ্রবল হবে। সান্দ্রবল F এই সান্দ্রবল F হবে গোলকের ব্যাসার্ধের সমানুপাতিক।

প্রথমে তরলের সান্দ্রতা গুণাঙ্কের সমানুপাতিক। এটা তো অবশ্যই। যদি পানি হয়, তাহলে ফ্রিকশনটা যে পরিমাণ হবে; যদি মধু হয়, তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—চিন্তা করো তো, মধুর মধ্য দিয়ে মার্বেল পড়তেছে আর পানির মধ্য দিয়ে পড়ছে। তো পানির মধ্য দিয়ে আগে পড়ে যাবে না? আর মধুর মধ্য দিয়ে দেরিতে পড়বে।

তাহলে কী হবে? সান্দ্রতা গুণাঙ্কের সমানুপাতিক।

সান্দ্রতা গুণাঙ্কের সমানুপাতিক, গোলকের ব্যাসার্ধের সমানুপাতিক এবং বেগের সমানুপাতিক।

তাহলে দেখো, F সমানুপাতিক—আর এই যে গোলক, তার ব্যাসার্ধ r এবং বেগ v। এই যে v বেগে যাচ্ছে, সে v বেগের সমানুপাতিক।

কমন সেন্স। তরলের ঘনত্ব মানে আঠাত্ব যত বেশি হবে, তত সান্দ্রবল বেশি হবে।

ব্যাসার্ধ যত বেশি হবে, তত সারফেস এরিয়া বেশি। ভালো করে বুঝবা কেন। ব্যাসার্ধ বেশি হলে সারফেসটা বেশি। একটা বড় গোলক, একটা ছোট গোলক। তাহলে এর সারফেস এরিয়া বেশি হলে ফ্রিকশনটা এর জন্য বেশি। এর সারফেস এরিয়া কম বলে ফ্রিকশনটা কম।

ব্যাসার্ধ যত বেশি হবে, ফ্রিকশনটা তত বেশি হবে। আর বেগ যত বেশি হবে, তত বেশি ফ্রিকশন হবে। যত বেশি বেগে গতিশীল, ফ্রিকশন ফোর্সটা তত বেশি থাকবে।

এবার সমানুপাতিক চিহ্ন উঠিয়ে দিয়ে ধ্রুবক আনতে হবে। এটার একটা ছোট্ট প্রমাণ আছে। সেই প্রমাণটা হচ্ছে মাত্রা সমীকরণের সাহায্যে প্রমাণ। আমি এটা দেখাবো একটু।

তো আগে আমি সূত্রটা দেখাই, তারপরে প্রমাণ দেখাচ্ছি।

এবার সমানুপাতিক চিহ্ন উঠে যায়, উঠে গিয়ে একটা ধ্রুবক আসে। বিজ্ঞানী স্টোকস এক্সপেরিমেন্টালি শান্ত প্রবাহের জন্য, এই যে শর্ত—শান্ত প্রবাহ বা ধারারেখ প্রবাহ এবং গোলক আকৃতির বস্তুর জন্য এখানে ধ্রুবকটা পাওয়া যায় 6π।

বিজ্ঞানী স্টোকস এটা হিসাব করছে। তাহলে 6πηrv। এটা হচ্ছে স্টোকসের সূত্র।

তাহলে কোনো তরলের মধ্য দিয়ে গোলক আকৃতির বস্তু গতিশীল হলে তার উপর সান্দ্রবল হচ্ছে—

স্টোকসের সূত্র
F = 6πηrv
স্টোকসের সূত্রের শর্তসমূহ
  1. প্রবাহী হতে হবে শান্ত প্রবাহী বা ধারারেখ প্রবাহী
  2. বস্তুটি হতে হবে গোলক আকৃতির
  3. প্রবাহী হতে হবে অসীমীয় (infinite)।

সূত্র:

F = 6πηrv

যেখানে,

  • F = সান্দ্র বল
  • η = সান্দ্রতা গুণাঙ্ক
  • r = গোলকের ব্যাসার্ধ
  • v = গোলকের বেগ
স্টোকসের সূত্রের প্রমাণ (মাত্রা সমীকরণের সাহায্যে)
স্টোকসের সূত্রের প্রমাণের চিত্র

আমরা জানি, সান্দ্রবল F নির্ভর করে—

  1. সান্দ্রতা গুণাঙ্ক η-এর উপর
  2. গোলকের ব্যাসার্ধ r-এর উপর
  3. বেগ v-এর উপর

অতএব,

F ∝ ηᵃ × rᵇ × vᶜ

বা,

F = k × ηᵃ × rᵇ × vᶜ

এখন মাত্রা বসাই—

F-এর মাত্রা = [MLT⁻²]

η-এর মাত্রা = [ML⁻¹T⁻¹]

r-এর মাত্রা = [L]

v-এর মাত্রা = [LT⁻¹]

তাহলে,

[MLT⁻²] = [ML⁻¹T⁻¹]ᵃ × [L]ᵇ × [LT⁻¹]ᶜ
[MLT⁻²] = [Mᵃ L⁻ᵃ⁺ᵇ⁺ᶜ T⁻ᵃ⁻ᶜ]

উভয় পাশে তুলনা করে—

M-এর ঘাত: a = 1

L-এর ঘাত: −a + b + c = 1

T-এর ঘাত: −a − c = −2

এখন a = 1 বসালে,

−1 − c = −2 ⇒ c = 1

এবং,

−1 + b + 1 = 1 ⇒ b = 1

তাই,

a = 1, b = 1, c = 1

সুতরাং,

F = k × η × r × v

পরীক্ষা করে দেখা গেছে শান্ত প্রবাহ ও গোলকের জন্য k = 6π।

স্টোকসের সূত্র
F = 6πηrv
প্লবতা ও সান্দ্রবলের পার্থক্য
প্লবতা ও সান্দ্রবলের চিত্র

পার্থক্য—প্লবতা এবং সান্দ্রবলের পার্থক্যটা একটু ভালো করে বুঝতে হবে। দেখো, কোনো তরলের মধ্য দিয়ে—ধরো, এটা একটা পাত্র। এই পাত্রে পানি আছে। শোনো, ভালো করে বুঝবা।

সান্দ্রবল সবসময় বস্তুর গতির বিপরীতে কাজ করে।

পানির মধ্যে একটা মার্বেল গতিশীল। পানির মধ্যে একটি ধাতব মার্বেল বা কাচের মার্বেল গতিশীল। মার্বেলটা কোন দিকে যাবে? নিচের দিকে যাবে। নিচের দিকে v বেগে যাবে।

তাহলে দেখো, মার্বেলটা নিচের দিকে v বেগে যাচ্ছে। তাহলে সান্দ্রবল—তরলের যে সান্দ্রবল, সেই সান্দ্রবল কাজ করবে ফ্রিকশন ফোর্স হিসেবে। এটা কাজ করবে কোন দিকে? উপরের দিকে।

এইটা হচ্ছে সান্দ্রবল F। তাহলে সান্দ্রবল উপরের দিকে কাজ করবে।

সান্দ্রবল F। গতি যেদিকে, সান্দ্রবল তার বিপরীত দিকে, অর্থাৎ উপরের দিকে।

যদি এরকম হয়, তরলের মধ্য দিয়ে একটা বায়ুবুদবুদ উপরের দিকে উঠতেছে। পানির মধ্য দিয়ে একটা বায়ুবুদবুদ। বলো, ঘটনা এবার কী ঘটবে?

পানির মধ্য দিয়ে বায়ুবুদবুদ। এই যে বায়ুবুদবুদ। বায়ুবুদবুদ কোন দিকে ওঠে? উপরের দিকে। তাহলে এর বেগ কোন দিকে? উপরের দিকে।

তাহলে বায়ুবুদবুদটা উপরে উঠতেছে। তাহলে পানি তাকে ধাক্কা দিবে নিচের দিকে। ফ্রিকশন সবসময় গতির বিপরীতে, আপেক্ষিক গতির বিপরীতে কাজ করে।

ঠিক তেমনি এই ক্ষেত্রেও সান্দ্রবলটা কাজ করবে। এই যে নিচের দিকে সান্দ্রবল, নিচের দিকে।

এইবার আসো, প্লবতা। প্লবতা বস্তুকে সবসময় ভাসিয়ে রাখতে চায়। প্লবতা বস্তুকে ভাসিয়ে রাখতে চায়।

এই বস্তুটা এই যে পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে, তরলে নিমজ্জিত। এর উপর প্লবতাও কাজ করবে। অবশ্যই কাজ করবে। প্লবতা কোন দিকে? অলওয়েজ উপরের দিকে।

প্লবতা সবসময় ভাসিয়ে রাখতে চায়।

প্লবতা কী? বস্তুর সম আয়তন তরলের ওজন। এই যে U, এটা হচ্ছে প্লবতা বল।

প্লবতা বল। কী এটা? বস্তুর সম আয়তন তরলের ওজন।

ঠিক আছে? প্লবতা।

এখানে কি প্লবতা নেই? হ্যাঁ। এই বায়ুবুদবুদ—বায়ু মানে কী? এটা বাতাসের বুদবুদ। ভিতরে বাতাস আছে। তাহলে এই যে বাতাস, এই বাতাসের বুদবুদের প্লবতা কোন দিকে? উপরের দিকে।

এটা প্লবতা। হ্যাঁ, প্লবতা অলওয়েজ উপরের দিকে কাজ করে।

তাহলে বস্তু কোন দিকে গতিশীল, এর উপর প্লবতা নির্ভর করে না। ভালো করে মাথায় ঢুকাও।

প্লবতা অলওয়েজ উপরের দিকে। ঠিক আছে?

এবার বল, এর ওজন আছে না? এই যে মার্বেল। এই মার্বেলের একটা ওজন আছে না? তাহলে এর উপরে আরও একটা বল আছে—ওজন। সেই ওজন কাজ করতেছে নিচের দিকে।

ওজন অলওয়েজ নিচের দিকে।

এটা যে বাতাস, এর ভিতরে যে বাতাস আছে—তাহলে বাতাসের হোক, নগণ্য ভর, তাও তো একটা ভর আছে। তাহলে ওজন কোন দিকে? নিচের দিকে।

তাহলে ওজন অলওয়েজ নিচের দিকে কাজ করে। ভালো করে বোঝো।

প্লবতা U সর্বদা উপরের দিকে। সর্বদা উপরের দিকে।

ওজন mg। ম্যাথ করার জন্য এটা লাগবে। কিন্তু সর্বদা নিচের দিকে।

আর সান্দ্রবল F। এই সান্দ্রবল F, এটা হচ্ছে গতির বিরুদ্ধে, গতির বিপরীত দিকে।

প্লবতা ও সান্দ্রবলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
বৈশিষ্ট্যপ্লবতা (U)সান্দ্রবল (F)
দিকসবসময় উপরের দিকেগতির বিপরীত দিকে
নির্ভরশীলতাবস্তুর আয়তনের উপরবস্তুর বেগের উপর
কারণতরলের চাপের পার্থক্যতরলের ঘর্ষণ
সূত্রU = ρgVF = 6πηrv (স্টোকস)
ভাসানো/ডুবানোবস্তুকে ভাসাতে চায়গতিকে বাধা দেয়

এই তিনটা জিনিস একটু সুন্দর করে মাথায় রাখবা। তাহলে পার্থক্যটা বোঝা গেছে।

অন্তবেগ বা প্রান্তবেগ (Terminal Velocity)
প্রান্তবেগের চিত্র

এইবার আসো, অন্তবেগ বা প্রান্তবেগ। লাস্ট টপিক—অন্তবেগ বা প্রান্তবেগ। ইংরেজিতে এটাকে বলা হয় Terminal Velocity

টার্মিনাল ভেলোসিটি। অন্তবেগ বা প্রান্তবেগ কী?

তুমি যদি একটা মার্বেলকে পানিতে এভাবে ধরে ছুড়ে দাও, মার্বেলটা কিছুক্ষণ পর প্রথমে কিছুক্ষণ ত্বরণ হতে পারে। কিন্তু পানির মধ্য দিয়ে, তরলের মধ্য দিয়ে, প্রবাহীর মধ্য দিয়ে ওই মার্বেলটা অবশ্যই, অবশ্যই, অবশ্যই সমবেগে গতিশীল হবে।

এই যে সমবেগে গতিশীল হবে, সমবেগ প্রাপ্ত হবে এবং এই সমবেগেই বাকি পথ সে নিচের দিকে নামবে।

ধরো, অনেক গভীর একটা পুকুর বা নদী। তুমি একটা মার্বেলকে ছুড়ে দিয়েছো। একটা গুলি ছুড়ে দিয়েছো। তাহলে গুলিটা নিচের দিকে যাবে। তো যখন তরলের মধ্য দিয়ে যাবে, তখন সে সমবেগে যাবে। কিছুক্ষণ ধরে ত্বরণ হতে পারে।

কিন্তু একটা সময় গিয়ে সমবেগ প্রাপ্ত হবে এবং এই সমবেগে বাকি পথ সে যাবে। এই প্রাপ্ত সমবেগটাকেই বলা হচ্ছে অন্তবেগ বা প্রান্তবেগ, বা ইংরেজিতে বলা হচ্ছে Terminal Velocity

সমবেগ প্রাপ্ত হবে—এটা আপনি বুঝলেন কেমনে? অবশ্যই সমবেগ প্রাপ্ত হবে। একটা বায়ুবুদবুদ নিচ থেকে উপরে আসা অথবা একটা মার্বেল উপর থেকে পানির উপর থেকে নিচের দিকে তলদেশের দিকে যাওয়া—অবশ্যই সমবেগ প্রাপ্ত হবে। হতেই হবে।

এই সমবেগ প্রাপ্ত হওয়ার এই ব্যাপারটাকে বলা হচ্ছে অন্তবেগ বা প্রান্তবেগ। কথা বুঝছো?

তাহলে তরলের মধ্য দিয়ে কোনো বস্তুর সমবেগে গতিশীল হওয়া—সমবেগে গতিশীল হলে সেই বেগকে অন্তবেগ বা প্রান্তবেগ বলে।

সংজ্ঞা (Definition): অন্তবেগ বা প্রান্তবেগ: তরলের মধ্য দিয়ে কোনো বস্তু গতিশীল হলে যে সর্বোচ্চ সমবেগ প্রাপ্ত হয় এবং এরপর বস্তুটি সেই বেগেই গতিশীল থাকে, তাকে অন্তবেগ বা প্রান্তবেগ বলে।
প্রান্তবেগ কীভাবে হয়?

এইটা হচ্ছে ধরো একটা গভীর নদী। তার মধ্যে একটা মার্বেলকে ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই মার্বেলটাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তো এই যে পানি, পানির মধ্য দিয়ে মার্বেলটা নিচের দিকে যাবে।

সে সমবেগ প্রাপ্তই হবে। হ্যাঁ, অবশ্যই সমবেগ প্রাপ্ত হবে এবং এই সমবেগটা হচ্ছে টার্মিনাল ভেলোসিটি বা প্রান্তবেগ।

কিভাবে সেটা হবে?

দেখো, এই যে মার্বেলটা—মার্বেলের গতি কোন দিকে? নিচের দিকে। নিচের দিকে যাচ্ছে। তাহলে চিন্তা করো, এর উপর কয়টা বল আছে? আমরা একটু এনালাইসিস করি তো।

একটা হচ্ছে ওজন বল mg (নিচের দিকে)। সান্দ্রবল F (উপরের দিকে)। প্লবতা বল U (উপরের দিকে)।

তো ব্যাপারটা হচ্ছে কী?

যখন বস্তুটি নিচের দিকে যেতে থাকে, তখন—

F_net = mg − F − U

এখন mg ও U স্থির, কিন্তু F = 6πηrv বেগের সাথে বাড়ে।

বেগ বাড়লে F বাড়তে থাকে। একসময় mg = F + U হয়, তখন F_net = 0 হয়।

F_net = 0 হলে নিউটনের প্রথম সূত্র অনুযায়ী—গতিশীল বস্তু সমবেগে চলতে থাকে। এই সমবেগই হলো প্রান্তবেগ

সময়ের সাথে বেগের পরিবর্তনের গ্রাফ

বোর্ডে তাকাও—এটা হচ্ছে বেগ v। এটা হচ্ছে সময় t। প্রথমে বেগটা বাড়ছিল, বাড়ছিল, বাড়ছিল। একটা সময় গিয়ে এই পয়েন্টে গিয়ে বেগ আর বাড়ে না। বেগ কনস্ট্যান্ট হয়ে গেছে।

এই যে বেগটা, এই বেগটাকে বলা হচ্ছে v_T বা Terminal Velocity

প্রান্তবেগের সূত্র নির্ণয়

এই হচ্ছে বস্তুটা। তরলের মধ্য দিয়ে বস্তুটা নিচের দিকে যাচ্ছে।

তরলের ঘনত্ব ρ এবং বস্তুর ঘনত্ব σ। ব্যাসার্ধ r।

প্রান্তবেগ প্রাপ্ত হলে, F_net = 0

তাই,

mg = F + U

এখন,

mg = (4/3)πr³ × σ × g
F = 6πηr × v_T
U = (4/3)πr³ × ρ × g

তাহলে,

(4/3)πr³ × σ × g = 6πηr × v_T + (4/3)πr³ × ρ × g
(4/3)πr³ × g × (σ − ρ) = 6πηr × v_T
v_T = (2r² × g × (σ − ρ)) / (9η)
প্রান্তবেগের সূত্র
v_T = (2r² × g × (σ − ρ)) / (9η)

যেখানে,

  • v_T = প্রান্তবেগ
  • r = বস্তুর ব্যাসার্ধ
  • σ = বস্তুর ঘনত্ব
  • ρ = তরলের ঘনত্ব
  • η = সান্দ্রতা গুণাঙ্ক
  • g = অভিকর্ষজ ত্বরণ
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

প্রান্তবেগের সাথে ব্যাসার্ধের সম্পর্ক—

v_T ∝ r²

অর্থাৎ, ব্যাসার্ধ দ্বিগুণ করলে প্রান্তবেগ চারগুণ হবে।

v₁ : v₂ = r₁² : r₂²

এবার তুমি বলো, বৃষ্টির ফোঁটা যখন পড়ে, অনেক উপর থেকে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে। তো বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে লাগলে ব্যথা লাগে না। কিন্তু শিলাবৃষ্টি হলে ওটা গায়ে লাগলে কিন্তু মাথায় মনে করে আলো উঠে যায়। বলো কেন? কারণ যত বেশি ব্যাসার্ধ হবে, তত v_T-এর মান বাড়বে।

বুঝতে পারছো?

বায়ুবুদবুদের ক্ষেত্রে

যদি বায়ুবুদবুদ হয়, তাহলে σ < ρ। তাহলে সূত্রে (σ − ρ) ঋণাত্মক হবে, ফলে v_T-এর মান ঋণাত্মক আসবে—যা বুঝায় যে দিক উপরের দিকে।

5