স্থিতিস্থাপকতা (Elasticity) – পীড়ন, বিকৃতি, ইয়ং গুণাঙ্ক ও আয়তন গুণাঙ্ক
কোনো একটি স্প্রিংকে টেনে প্রসারিত করা হলো। স্প্রিংটি তার স্বাভাবিক অবস্থা থেকে \(x\) পরিমাণ প্রসারিত হলো।
স্প্রিংটি কি এমনিতেই প্রসারিত হয়েছে? না। তুমি বল প্রয়োগ করেছ বলেই এটি প্রসারিত হয়েছে। তুমি স্প্রিংটিকে যে বলে টানছ, সেটিকে \(F_{ext}\) বা External Force (বাহ্যিক বল) বলা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, স্প্রিংটি কি এই অবস্থায় থাকতে চায়? না। স্প্রিংটি তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে চায়। তাই এটি তোমার প্রয়োগকৃত বলের বিপরীত দিকে, সাম্যাবস্থার অভিমুখে একটি বল প্রয়োগ করে। এই বলকে প্রত্যয়নী বল (Restoring Force) বলা হয়, যার প্রতীক \(F_r\)।
এই প্রত্যয়নী বলের কারণেই স্প্রিংটি তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে চায়। তুমি যদি বাহ্যিক বল অপসারণ করে নাও, তাহলে প্রত্যয়নী বলের প্রভাবে স্প্রিংটি আবার তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে। বল অপসারণের পর বস্তুর পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার এই ধর্মকেই স্থিতিস্থাপকতা (Elasticity) বলা হয়।
তবে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই স্প্রিংয়ের ওপর বল প্রয়োগ করতে হবে। তুমি যদি অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে স্প্রিংটিকে বেশি প্রসারিত করো, তাহলে এটি স্থায়ীভাবে বিকৃত হয়ে যেতে পারে। তখন এটি আর পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে না। অর্থাৎ, এর স্থিতিস্থাপক ধর্ম নষ্ট হয়ে যাবে। তাই সবসময় স্থিতিস্থাপক সীমার (Elastic Limit) মধ্যে বল প্রয়োগ করতে হবে।
অর্থাৎ, এমন পরিমাণ বল প্রয়োগ করতে হবে যাতে বল অপসারণ করার পর বস্তুটি আবার তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে।
স্থিতিস্থাপকতা শুধু স্প্রিংয়ের ক্ষেত্রেই নয়; তার, ধাতব দণ্ড, ধাতব গোলকসহ বিভিন্ন বস্তুর ক্ষেত্রেও দেখা যায়।
ধরা যাক, একটি ধাতব তার একটি দৃঢ় অবলম্বন থেকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তারটির প্রাথমিক দৈর্ঘ্য \(L\)। এবার তারটির দৈর্ঘ্য বরাবর একটি বল প্রয়োগ করা হলো। স্থিতিস্থাপক সীমার মধ্যে বল প্রয়োগ করলে তারটির দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাবে। যদি দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি হয় \(l\) এবং তারটির প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল হয় \(A\), তাহলে এই পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা স্থিতিস্থাপকতার বিভিন্ন রাশি সংজ্ঞায়িত করতে পারি।
স্থিতিস্থাপক সীমার মধ্যে বল প্রয়োগ করলে বস্তুর আকার বা আকৃতির পরিবর্তন ঘটে। একক মাত্রায় সংঘটিত আপেক্ষিক পরিবর্তনকে বিকৃতি (Strain) বলা হয় এবং একক ক্ষেত্রফলে লম্বভাবে প্রযুক্ত বিকৃতি-প্রতিরোধী বলকে পীড়ন (Stress) বলা হয়।
স্থিতিস্থাপকতা প্রধানত তিন প্রকার—
একটি ধাতব তার একটি দৃঢ় অবলম্বন থেকে ঝুলানো হলো। তারের আদি দৈর্ঘ্য \(L\)।
তারের দৈর্ঘ্য বরাবর বল প্রয়োগ করা হলো। দৈর্ঘ্য বরাবর বল প্রয়োগ করাকে অনুদৈর্ঘ্য বল প্রয়োগ বলা হয়। অর্থাৎ, তারের প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলের উপর লম্বভাবে বল প্রয়োগ করা হলো।
প্রযুক্ত বলের মান \(F\)। ফলে স্থিতিস্থাপক সীমার মধ্যে তারের দৈর্ঘ্য \(l\) পরিমাণ বৃদ্ধি পেল। আমাদের প্রযুক্ত বল বা External Agent কর্তৃক প্রযুক্ত বল, \(F_{ext}=F\)
এখানে দৈর্ঘ্য \(l\) পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত, একক দৈর্ঘ্যে দৈর্ঘ্যের যে পরিবর্তন ঘটে তাকে দৈর্ঘ্য বিকৃতি (Longitudinal Strain) বলে।
\(L\) দৈর্ঘ্যে দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি = \(l\)
\(1\) একক দৈর্ঘ্যে দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি = \(\dfrac{l}{L}\)
এবার আসি দৈর্ঘ্য পীড়নে। পীড়ন কী? পীড়ন হলো চাপের মতো একটি রাশি। পীড়ন হলো একক ক্ষেত্রফলে প্রযুক্ত বল।
উপররের চিত্রে তারকে জুম করে প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল \(A\) দেখানো হয়েছে।
\(A\) ক্ষেত্রফলের সাথে লম্বভাবে External Agent কর্তৃক \(F_{ext}\) বা \(F\) বল প্রয়োগ করা হয়।
একক ক্ষেত্রফলে External Agent বা আমি নিচের দিকে যে বল প্রয়োগ করছি, সেটা আসলে চাপের মতো কাজ করে। কিন্তু তারটি পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসার জন্য একক ক্ষেত্রফলে যে প্রত্যয়নী বল (Restoring Force) প্রদান করে, সেটিই হলো পীড়ন।
\(A\) ক্ষেত্রফলে প্রযুক্ত বল = \(F\)
\(1\) (একক) ক্ষেত্রফলে প্রযুক্ত বল = \(\dfrac{F}{A}\)
পীড়ন আসলে আমরা প্রযুক্ত করি না। আমরা চাপ প্রয়োগ করে বিকৃতি সৃষ্টি করতে চাই। ফলে বস্তুর ভিতর থেকে সৃষ্ট Restoring Force বা প্রত্যয়নী বলের কারণে পীড়ন সৃষ্টি হয়।
তাহলে বলা যায় যে, বিকৃতি হলো পীড়নের কারণ। ফলে পীড়ন ও বিকৃতির সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞানী হুক একটি সূত্র প্রয়োগ করেন।
স্থিতিস্থাপক সীমার মধ্যে,
কৃতকাজ, \(W = Fl\cos 0^\circ\)
\(W = Fl\) (ধ্রুব বল দ্বারা কাজ সম্পাদিত হলে।)
ইয়ং গুণাঙ্ক,
পরিবর্তনশীল বল দ্বারা কাজ করতে হলে, প্রথমে মোট সরণ থেকে একটি ক্ষুদ্র সরণ নিতে হবে।
ক্ষুদ্র সরণ = \(dl\)
বল প্রয়োগের শুরুতে প্রসারণ বা সরণ = \(0\)
বল প্রয়োগের শেষে প্রসারণ বা সরণ = \(l\)
\(dl\) ক্ষুদ্র সরণে কৃতকাজ,
যেহেতু বল ও সরণের মধ্যবর্তী কোণ \(0^\circ\), তাই,
অতএব, মোট কৃতকাজ,
এই কাজটি External Agent করেছে। এই কাজটিই তারের মধ্যে স্থিতিশক্তি হিসেবে জমা হয়। তাই,
যেহেতু,
তাহলে,
একক আয়তনে সঞ্চিত শক্তি বা স্থিতিশক্তি,
\(V\) আয়তনে সঞ্চিত স্থিতিশক্তি = \(W\)
\(1\) আয়তনে সঞ্চিত স্থিতিশক্তি = \(\dfrac{W}{V}\)
আয়তন, \(V = AL\)
মনে করো, একটি ধাতব গোলক যার আদি আয়তন \(V\)। এবার ধাতব গোলকটির উপর সব দিক থেকে সমানভাবে বল প্রয়োগ করা হলো। ফলে গোলকটির আয়তন \(v\) পরিমাণ হ্রাস পেল। সুতরাং হ্রাসপ্রাপ্ত গোলকটির আয়তন হবে \(V-v\)।
এখানে গোলকটিকে বল প্রয়োগ করে বিকৃত করা হলো। ফলে স্থিতিস্থাপক ধর্মের কারণে গোলকটি তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে চাইবে এবং External Agent কর্তৃক প্রযুক্ত বলের বিপরীতে প্রত্যয়নী বল (Restoring Force) কাজ করবে।
\(V\) আয়তনে আয়তনের পরিবর্তন = \(v\)
\(1\) একক আয়তনে আয়তনের পরিবর্তন = \(\dfrac{v}{V}\)
স্থিতিস্থাপক সীমার মধ্যে পীড়ন ও বিকৃতির অনুপাত একটি ধ্রুবক। দৈর্ঘ্য বিকৃতির ক্ষেত্রে এই ধ্রুবককে ইয়ং-এর গুণাঙ্ক বলা হয়।
আয়তন পীড়ন ও আয়তন বিকৃতির অনুপাত একটি ধ্রুবক। এই ধ্রুবককে আয়তন স্থিতিস্থাপক গুণাঙ্ক (Bulk Modulus) বলা হয়।
যেহেতু,
সুতরাং,
আয়তন স্থিতিস্থাপক গুণাঙ্কের একটি গুণাত্মক বিপরীত রাশি আছে। সেটি হলো সংনম্যতা (Compressibility), যা \(K\) দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
যদি \(V = 1\) একক এবং \(P = 1\) একক হয়, তাহলে
আয়তন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কৃতকাজ নির্ণয় করতে গেলে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এখানে চাপ \(P\) এবং আয়তনের পরিবর্তন \(v\) এর মধ্যে সম্পর্ক:
যেহেতু \(P \propto v\) (চাপ আয়তন পরিবর্তনের সমানুপাতিক), তাই এটি একটি পরিবর্তনশীল বলের ক্ষেত্রে কাজ।
ক্ষুদ্র আয়তন পরিবর্তন \(dv\)-এর জন্য কৃতকাজ,
মোট কৃতকাজ,
এই কাজটিই বস্তুর মধ্যে স্থিতিশক্তি হিসেবে সঞ্চিত হয়।
একক আয়তনে সঞ্চিত শক্তি,
যেহেতু,
তাহলে,
অর্থাৎ, একক আয়তনে সঞ্চিত স্থিতিশক্তি সর্বদা \(\dfrac{1}{2} \times \text{পীড়ন} \times \text{বিকৃতি}\)-এর সমান।